Image

শ্রবণপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে কে-পপ ব্যান্ড বিগ ওশান

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 1 ঘন্টা আগেআপডেট: 1 সেকেন্ড আগে
শ্রবণপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে কে-পপ ব্যান্ড বিগ ওশান

শ্রবণপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে কে-পপ ব্যান্ড বিগ ওশান

শ্রবণপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বিশ্বমঞ্চে কে-পপ ব্যান্ড বিগ ওশান

গান, নাচ ও ইশারা ভাষায় দর্শক মাতাচ্ছেন তিন শিল্পী

মঞ্চে বাজছে গান। তিন তরুণের নাচের সঙ্গে মিলছে হাতের ইশারা। গানের কথা ও আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে তাঁদের অঙ্গভঙ্গিতে। সামনে উচ্ছ্বসিত দর্শক, আর সেই উচ্ছ্বাসের মধ্যেই এগিয়ে চলছে পরিবেশনা। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ ব্যান্ড বিগ ওশানের কনসার্টের দৃশ্য। দলটির তিন সদস্যই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তবে সেই সীমাবদ্ধতাকে নিজেদের পরিচয়ের একমাত্র অংশ হতে না দিয়ে গান, নাচ ও ইশারা ভাষার সমন্বয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র পরিবেশনাশৈলী।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের কনসার্টের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করে বিগ ওশান। আট শহরের এই সফরের প্রথম কনসার্টের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে দলটি। তাদের পরিবেশনা যেমন দর্শকদের আকৃষ্ট করছে, তেমনি সংগীত উপভোগের প্রচলিত ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করছে।

যেভাবে তৈরি হলো বিগ ওশান

বিগ ওশানের তিন সদস্য পি জে, কিম জিসক ও লি চানইয়নের প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। পি জে আগে ইউটিউবে ভিডিও তৈরি করতেন। পাশাপাশি শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করেছেন তিনি। কিম জিসক ছিলেন প্রতিযোগিতামূলক আলপাইন স্কিয়ার। অন্যদিকে, লি চানইয়ন কাজ করেছেন শ্রবণবিশেষজ্ঞ হিসেবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্যারাস্টার এন্টারটেইনমেন্টের উদ্যোগে একত্র হন তাঁরা। এরপর শুরু হয় সংগীত ও নাচের প্রশিক্ষণ। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল ‘গ্লো’ গান প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিগ ওশান।

দল গঠনের পর থেকেই সদস্যদের সামনে ছিল একাধিক চ্যালেঞ্জ। গান গাওয়ার পাশাপাশি নাচের তাল মেলানো, গানের কথা প্রকাশ করা এবং মঞ্চে একসঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে পরিবেশনা চালিয়ে যাওয়া—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন হয়েছে নিয়মিত অনুশীলন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তির সহায়তা।

গানের সঙ্গে ইশারা ভাষার সমন্বয়

বিগ ওশানের পরিবেশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইশারা ভাষার ব্যবহার। সদস্যরা শুধু গানের তালে হাত নাড়িয়ে নাচেন না; বরং গানের কথা, অনুভূতি ও আবেগও ইশারার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এ কারণে নাচের ধাপ শেখার পাশাপাশি গানের অর্থ অনুযায়ী ইশারা ভাষার অনুশীলনও করতে হয়। পরে এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয় তাঁদের মঞ্চ পরিবেশনা।

এই পদ্ধতিতে শ্রবণপ্রতিবন্ধী দর্শকেরা গানের কথা ও আবেগ বোঝার সুযোগ পান। একই সঙ্গে অন্য দর্শকেরাও গানের অর্থকে দৃশ্যের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারেন। ফলে বিগ ওশানের পরিবেশনা কেবল গান শোনা বা নাচ দেখার অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এতে যুক্ত হয় ভাষা, অভিব্যক্তি ও দৃশ্যমান যোগাযোগের ভিন্ন মাত্রা।

তবে সরাসরি মঞ্চে পরিবেশনার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৪ সালে প্যারিসের একটি অনুষ্ঠানে দর্শকদের উল্লাসের কারণে গানের শব্দ শোনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সদস্যদের পরস্পরের সংকেতের ওপর নির্ভর করে পরিবেশনার সমন্বয় বজায় রাখতে হয়।

তাল বুঝতে প্রযুক্তির সহায়তা

সংগীতের ছন্দ ও তাল আয়ত্ত করতে বিগ ওশানের সদস্যরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। অনুশীলনের সময় কম্পন তৈরি করতে পারে এমন স্মার্টওয়াচ তাঁদের তাল বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ মেট্রোনোম ও আলোর সংকেতও অনুশীলনে কাজে লাগে।

তবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই তাঁদের পরিবেশনা তৈরি হয় না। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে সদস্যরা গানের ছন্দ, নাচের ধাপ এবং একে অন্যের সংকেতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মঞ্চে কেউ সামান্য দেরি করলে অন্যরা সমন্বয় করে পরিবেশনা এগিয়ে নিতে পারেন। এই পারস্পরিক বোঝাপড়া তাঁদের দলীয় পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। কণ্ঠের স্বর, সুর ও তাল ঠিক রাখতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ডিজিটাল অডিও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। প্রযুক্তি এখানে শিল্পীদের নিজস্ব কণ্ঠের বিকল্প নয়; বরং তাঁদের সংগীতকে আরও পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে।

পরিচয়ের বাইরে নিজেদের শিল্পীসত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

বিগ ওশানকে ঘিরে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সদস্যদের শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা। তবে তাঁরা চান, দর্শক তাঁদের শুধু এই পরিচয়ের কারণে নয়, সংগীত ও পরিবেশনার মানের জন্যও মনে রাখুক।

২০২৫ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় মিনি অ্যালবাম ‘আন্ডারওয়াটার’-এর মাধ্যমে নিজেদের সংগীতের পরিসর আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছে দলটি। তাদের গান ও পরিবেশনায় উঠে আসে আত্মবিশ্বাস, ঐক্য এবং প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা।

বিগ ওশানের যাত্রা দেখিয়েছে, সংগীত উপভোগের অভিজ্ঞতা কেবল শব্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। কম্পন, আলো, দৃশ্য, শরীরী অভিব্যক্তি ও ইশারা ভাষাও সংগীতের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে। তাঁদের পরিবেশনা শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পীদের জন্য সংগীতজগতে অংশগ্রহণের নতুন সম্ভাবনাও তুলে ধরছে।

নিজেদের আলাদা পরিচয়কে শক্তিতে রূপান্তর করে বিগ ওশান এখন আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাঁদের লক্ষ্য শুধু প্রচলিত ধারণা ভাঙা নয়, বরং গান ও শিল্পের মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে এমন এক সংযোগ তৈরি করা, যেখানে শোনার ধরন ভিন্ন হলেও সংগীতের আবেগ সবার কাছে পৌঁছাতে পারে।

সূত্র: এপি, দ্য গার্ডিয়ান ও গ্র্যামি ডটকম অবলম্বনে।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three