একদিন নামটাই জানত না আর্জেন্টিনা, আজ সেই মেসির বিদায়ে কাঁদবে পুরো দেশ
- 1
বাংলাদেশ ভ্রমণ ম্যাপ, আমার বাংলাদেশ। যেভাবে বানাবেন ভ্রমণ ম্যাপের ছবি
- 2
প্রীতম–শেহতাজের বিবাহবিচ্ছেদ, জানালেন আলাদা হওয়ার কারণ
- 3
২০ বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবার লজ্জিত মদ্রিচ, ইংল্যান্ডের কাছে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়া
- 4
রিবাকিনার পর সাবালেঙ্কাকেও হারালেন বার্তুনকোভা, চায়না ওপেনে বড় অঘটন
- 5
একসময় স্কুলের বেতন দিতে পারেননি, এখন ৩ হাজার কোটি রুপির মালিক সালমান খান

একদিন নামটাই জানত না আর্জেন্টিনা, আজ সেই মেসির বিদায়ে কাঁদবে পুরো দেশ
একদিন নামটাই জানত না আর্জেন্টিনা, আজ সেই মেসির বিদায়ে কাঁদবে পুরো দেশ
একজন এএফএ কর্মকর্তা রোজারিওর টেলিফোন ডিরেক্টরিতে একটি পরিবারের নাম খুঁজছিলেন। অবশেষে যোগাযোগও হলো। কিন্তু ফোনের ওপাশে ‘লিওনার্দো’কে চাওয়ার পর সংশোধন এল—‘ওর নাম লিওনার্দো নয়, লিওনেল।’
যে ছেলেটিকে একসময় চিনতেই পারেনি আর্জেন্টিনা, সময়ের সঙ্গে সেই লিওনেল মেসিই হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একজন। মঙ্গলবার বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নামবেন তিনি। দুই দশকের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামবে সেখানেই।FIFA
অথচ মেসি ও আর্জেন্টিনার এই সম্পর্কের শুরুটা ছিল ভুল নাম, সংশয় আর দূরত্বে ভরা।

বার্সেলোনায় থাকা ‘রোজারিওর ছেলেকে’ খুঁজতেই হিমশিম
কিশোর বয়সেই মেসি চলে গিয়েছিলেন বার্সেলোনায়। সেখানে তাঁর প্রতিভা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল। এমনকি স্পেনও তাঁকে নিজেদের জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিল। অথচ নিজের দেশেই তখন তাঁকে নিয়ে ছিল অজ্ঞতা।
২০০৩ সালে ফিনল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ৩-২ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ সেস্ক ফ্যাব্রেগাস নাকি ম্যাচের পর আর্জেন্টাইনদের বলেছিলেন, তাঁদের সেরা খেলোয়াড়টি তো বার্সেলোনাতেই রয়ে গেছে।
আর্জেন্টিনার যুব দলের কোচ উগো তোকাল্লিও পরে জানিয়েছেন, ওই টুর্নামেন্টে স্পেন দলের এক কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার দরকার বার্সেলোনায় খেলা রোজারিওর সেই ছেলেটিকে।
সমস্যা হলো—সেই ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়াই সহজ ছিল না।
এএফএর কর্মকর্তা ওমর সৌতো রোজারিওর টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে মেসি পরিবারের সন্ধান পান। কিন্তু ফোন করে তিনি চাইলেন ‘লিওনার্দো’কে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নামটি লিওনার্দো নয়,লিওনেল।
বিভ্রান্তি সেখানেই শেষ হয়নি। আর্জেন্টাইন ফেডারেশন বার্সেলোনায় মেসির বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে তাঁর পদবি ‘মেচ্চি’ লিখেছিল বলেও উল্লেখ করেছেন সাংবাদিক সের্হিও লেভিনস্কি। মেসিকে ইতালীয় বংশোদ্ভূত ভেবে এমন বানান করা হয়েছিল বলে তাঁর বর্ণনা।
জাতীয় দলে এসেও সহজ ছিল না পথ
২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। কিন্তু সংশয় তখনো কাটেনি। ২০০৫ সালে নেদারল্যান্ডসে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে শুরুতে তাঁকে বেঞ্চেই রাখা হয়েছিল।
কারণ, তিনি তো দেশে থাকতেন না। বার্সেলোনায় বেড়ে ওঠা মেসিকে অনেকে প্রায় বিদেশি হিসেবেই দেখতেন। অথচ ক্লাব ফুটবলে তাঁর উত্থান তখন এতটাই দ্রুত হচ্ছিল যে জাতীয় দলে তাঁকে উপেক্ষা করার সুযোগও ক্রমেই কমে আসছিল।
সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেকও ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। ২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নামার মাত্র ৪৭ সেকেন্ড পরই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মেসি।
এরপর শুরু হয় সমালোচনা। বার্সেলোনার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখা না যাওয়ায় প্রশ্ন উঠতে থাকে। এমনকি একসময় তাঁকে ‘পেচো ফ্রিও’—অর্থাৎ দেশের প্রতি আবেগহীন—বলেও কটাক্ষ করা হতো।
২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথটা প্রত্যাশামতো মসৃণ হয়নি।
২০১৬-এর কান্নাই বদলে দিল সম্পর্ক
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে মেসির পেনাল্টি মিস। একের পর এক ফাইনালে ব্যর্থতার পর হতাশ মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই ঘটনাই আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বদলে দেয়।

এবার সমালোচনা নয়, তাঁকে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে শুরু করে পুরো দেশ। মানুষ বুঝতে শুরু করে, একের পর এক ফাইনালে দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়টির ওপর সব ব্যর্থতার দায় চাপানো যায় না।
২০১১ সালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের একটি ম্যাচে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মেসির লড়াকু পারফরম্যান্সও তাঁর প্রতি সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে ভূমিকা রাখে। লেভিনস্কির ভাষায়, সেই ম্যাচে মেসি এতটাই লড়েছিলেন যে ক্লান্তিতে বমিও করেছিলেন—তবু দলকে জিতিয়েছিলেন।
সেখান থেকেই যেন শুরু হয় নতুন মেসি-আর্জেন্টিনা সম্পর্ক।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি
লিওনেল স্কালোনির অধীনে মেসি যেন জাতীয় দলে নিজের নতুন পরিচয় খুঁজে পান। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জিতে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটান। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ এনে দেন।
এরপর আসে আরও সাফল্য। কোপা আমেরিকার শিরোপা, বিশ্বকাপের মঞ্চে নেতৃত্ব, আর দেশের মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা।
যে মেসিকে একসময় দেশের প্রতি টান নেই বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।
ম্যারাডোনার মতো, আবার আলাদাও
আর্জেন্টিনায় মেসির সঙ্গে ডিয়েগো ম্যারাডোনার তুলনা হয়েছে পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই। তবে দুজনের প্রতি দেশের ভালোবাসার পথ ছিল ভিন্ন।
ম্যারাডোনাকে আর্জেন্টিনা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আপন করে নিয়েছিল। মেসির ক্ষেত্রে সেই ভালোবাসা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে। শৈশব ও ক্যারিয়ারের বড় অংশ দেশের বাইরে কাটানো মেসিকে আপন করে নিতে আর্জেন্টাইনদের সময় লেগেছে।
সের্হিও লেভিনস্কির উপমাটি তাই বেশ আবেগময়—মেসিকে ভালোবাসার গল্পটা যেন এমন,হঠাৎ জানতে পারলেন আপনার ১৮ বছরের একটি ছেলে আছে, যাকে এত দিন চিনতেনই না।
সেই অচেনা ছেলেটিই আজ আর্জেন্টিনার সবচেয়ে আপনজনদের একজন।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সি পরবেন মেসি। এএফএ জানিয়েছে, ম্যাচটি তাঁর বিদায়ী ম্যাচ হিসেবে বিশেষভাবে আয়োজন করা হয়েছে।AFA Official Site
একদিন তাঁর নামটাও ঠিকঠাক জানত না আর্জেন্টিনা। আর আজ তাঁর শেষ ম্যাচে সেই দেশের হাজার হাজার কণ্ঠ একসঙ্গে ডাকবে—
লিওনেল মেসি।














