ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলের পতন, কোথায় হারাল সেই ফুটবল-জাদু?
- 1
মাও সে–তুংকে নিয়ে মিমের বিতর্কে এমবাপ্পে, সম্পর্ক ছিন্ন করল চীনের দুই প্রতিষ্ঠান
- 2
ব্যালন ডি’অরের রাতে সানসা স্টার্ক, বার্না বয় ও আরও তারকার ঝলক
- 3
ব্যালন ডি’অর ২০২৬: কে কোন পুরস্কার জিতলেন, এক নজরে
- 4
ব্যালন ডি’অর বিজয়ীদের তালিকা: ১৯৫৬ থেকে ২০২৬
- 5
ইয়ামাল-এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে ব্যালন ডি’অর জিতলেন হ্যারি কেইন

ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলের পতন, কোথায় হারাল সেই ফুটবল-জাদু?
ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলের পতন, কোথায় হারাল সেই ফুটবল-জাদু?
একসময় ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ানদের ছিল রাজকীয় উপস্থিতি। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও, কাকা—একেকজন ছিলেন ফুটবলের জাদুকর। তাঁদের পায়ের শিল্পে মুগ্ধ হয়েছে গোটা পৃথিবী, আর তাঁদের হাতেই উঠেছে বিশ্বসেরার সোনালি বল। কিন্তু সেই সোনালি দিনগুলো যেন এখন শুধুই স্মৃতি।
লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে এবারের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠান সেই হারানো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিল। ছেলেদের ব্যালন ডি’অরের ট্রফি তুলে দিতে মঞ্চে উঠেছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও। ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির উচ্ছ্বাস আর বড় পর্দায় রোনালদোর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের দৃশ্য—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল প্রতীকী। ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিল যেন এখনো বেঁচে আছে অতীতের আলোয়, বর্তমানটা বড় বিবর্ণ।
গত এপ্রিলে ফরাসি সংবাদমাধ্যমলেকিপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি রোমারিও বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জিততে পারবে না।’
তখন কথাটিকে অনেকের কাছেই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিল। বিশেষ করে গত মাসে ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় যখন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের নাম দেখা গেল। কিছুদিন আগেও ভিনিসিয়ুসকে অনেকে পুরস্কার জয়ের অন্যতম ফেবারিট মনে করতেন। অথচ লন্ডনের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতিই ছিল না।
হয়তো আগেই বুঝেছিলেন, এবার তাঁর হাতে সোনালি বল উঠছে না। শেষ পর্যন্ত ভোটে শীর্ষ দশেও জায়গা হয়নি রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের। হয়েছেন ১৭তম।
মেয়েদের ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ দশেও ছিলেন না কোনো ব্রাজিলিয়ান। ছেলে ও মেয়েদের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কারের শীর্ষ পাঁচেও জায়গা পাননি দেশটির কেউ। গোলকিপারদের পুরস্কারে অবশ্য ব্রাজিলকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছেন নারী দলের গোলরক্ষক লোরেনা। মেয়েদের বর্ষসেরা গোলকিপারের তালিকায় পঞ্চম হয়েছেন তিনি।
কিন্তু একসময় তো ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ানদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তাহলে সেই আধিপত্য হারিয়ে গেল কোথায়?
১৯ বছর ধরে অধরা সোনালি বল
ছেলেদের ব্যালন ডি’অরের কোনো বিভাগে সর্বশেষ কবে পুরস্কার জিতেছেন ব্রাজিলের কেউ? উত্তর পেতে ফিরে যেতে হবে ২০১৯ সালে। সেবার সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জিতেছিলেন আলিসন বেকার। তবে ব্রাজিলের মতো আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী দেশের সমর্থকদের কাছে গোলকিপারের পুরস্কার হয়তো সান্ত্বনা মাত্র।
যে দেশের ফুটবল মানেই আক্রমণের ফুলঝুরি, ড্রিবলিংয়ের জাদু, সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার আর দুরন্ত ফুলব্যাক—সেই দেশের সমর্থকদের প্রত্যাশা তো আরও বড়।
মূল ব্যালন ডি’অর? সর্বশেষ কোনো ব্রাজিলিয়ানের হাতে উঠেছিল ২০০৭ সালে। সেবার জিতেছিলেন কাকা। এরপর কেটে গেছে ১৯ বছর। ব্রাজিলের ফুটবলে এসেছে নতুন প্রজন্ম, অনেক প্রতিভা উঠে এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু বিশ্বসেরার সোনালি বল আর ফেরেনি।
১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর ছিল শুধু ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য। ইউরোপের ক্লাবে খেললেও অন্য মহাদেশের খেলোয়াড়েরা এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতেন না। ১৯৯৫ সালে নিয়ম বদলায়। ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলারের জন্য খুলে যায় পুরস্কারের দরজা।
এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মাত্র চারবার ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনে কোনো ব্রাজিলিয়ান ছিলেন না—২০০০, ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৬ সালে। এই সময়ের মধ্যে ব্রাজিলিয়ানরা পাঁচবার পুরস্কারটি জিতেছেন। বিজয়ীদের নাম রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকা।
তখন ব্রাজিল ছিল বিশ্ব ফুটবলের প্রতিভা তৈরির কারখানা। একজন জাদুকর বিদায় নিলে হাজির হতেন আরেকজন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যেন সেই কারখানার উৎপাদন কমে গেছে।
মেসি-রোনালদোর যুগে থমকে গেল ব্রাজিল
ব্রাজিলের ব্যালন ডি’অর-খরা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যুগের কথা আসবেই। বিশ্ব ফুটবলে তাঁদের দীর্ঘ আধিপত্য অন্যদের জন্য পুরস্কার জেতার পথ কঠিন করে তুলেছিল। ২০১৮ সালে লুকা মদরিচ সেই আধিপত্যে বড় ধাক্কা দেন।
এই সময়ে ব্রাজিলের হয়ে লড়াই করেছেন নেইমার। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে ব্যালন ডি’অরের ভোটে তৃতীয় হয়েছিলেন তিনি। প্রতিভার বিচারে নেইমারকে মেসি কিংবা রোনালদোর চেয়ে পিছিয়ে রাখতেন না অনেকেই। কিন্তু প্রতিভা থাকা আর ধারাবাহিকভাবে তার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো এক বিষয় নয়। মাঠের পারফরম্যান্সে শেষ পর্যন্ত দুই মহাতারকার পেছনেই থাকতে হয়েছে নেইমারকে।
কাকার পর নেইমার ছাড়া আর মাত্র একজন ব্রাজিলিয়ান ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনে উঠেছেন—ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ ২০০৭ সালের পর ১৯ বছরে মাত্র তিনবার শীর্ষ তিনে দেখা গেছে ব্রাজিলের কাউকে—নেইমার দুবার, ভিনিসিয়ুস একবার।
রাফিনিয়া ও এস্তেভাওয়ের মতো প্রতিভারা উঠে আসছেন। তবে তাঁদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সময় এখনো আসেনি। এই সময়ে ভিনিসিয়ুসই একবার ব্রাজিলকে বিশ্বসেরার মঞ্চে সাফল্য এনে দিয়েছেন। সেটি ব্যালন ডি’অর নয়, ২০২৪ সালের ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কার।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হলো? যে দেশ একসময় ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ব্রাজিল এখন বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরিতে পিছিয়ে পড়ছে কেন?
বয়সভিত্তিক ফুটবল ও খেলোয়াড় তৈরির সংকট
ক্রীড়া বিপণন, যোগাযোগ ও খেলাধুলায় উদ্ভাবনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ব্রাজিলে ফ্ল্যাশস্কোরের আঞ্চলিক পরিচালক আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোস সমস্যাটিকে দেখছেন ফুটবলার তৈরির কাঠামোগত সংকট হিসেবে।
তাঁর বিশ্লেষণ, বিশ্বমানের সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক ও সেন্টার ফরোয়ার্ডের ঘাটতি ব্রাজিলের খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বয়সভিত্তিক ফুটবলের মূল কাঠামো ঢেলে সাজানো ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন। বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সতর্ক করলেও পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে দেখতে সময় লাগবে।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) একাডেমির অধ্যাপক ও কোচ রজার মাচাদোর বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি।
তাঁর ভাষায়, বিশ্বের সেরা ১০ খেলোয়াড়ের তালিকায় কোনো ব্রাজিলিয়ানের না থাকাটাই দেখিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক ফুটবল কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, জার্মানি ও পর্তুগাল কুশলী খেলোয়াড় তৈরিতে অনেক এগিয়েছে। এমনকি ক্রোয়েশিয়া ও বেলজিয়ামের মতো দেশ থেকেও কোনো কোনো সময়ে ব্রাজিলের তুলনায় বেশি বিশ্বমানের খেলোয়াড় উঠে আসতে দেখা গেছে।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু ব্রাজিলের প্রতিভা কমে যাওয়ায় নয়; অন্য দেশগুলোও খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থায় উন্নতি করেছে।
রাস্তার ফুটবল কি হারিয়ে যাচ্ছে?
রোমারিও অবশ্য সমস্যার শিকড় খুঁজছেন আরও ভিন্ন জায়গায়। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটালেও সে সময়কার নিয়মের কারণে ব্যালন ডি’অর জেতার সুযোগ পাননি তিনি। তাঁর মতে, ব্রাজিলের ফুটবলের কাঠামো এতটাই বদলে গেছে যে আপাতত দেশটির কোনো খেলোয়াড়ের এই পুরস্কার জেতার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই।
রোমারিওর ভাষায়, ‘ব্রাজিলিয়ান ফুটবল আর আগের জায়গায় নেই। ১৫ বা ২০ বছর আগে যেভাবে ফুটবলারদের ব্যালন ডি’অরের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হতো, এখন আর সেই পরিবেশ নেই।’
কোন পরিবেশের কথা বলছেন তিনি? ব্রাজিলের সেই চেনা রাস্তার ফুটবল—গলি, সমুদ্রসৈকত ও খোলা মাঠে বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো। সেখানে ছিল না কোচের বাঁধাধরা নির্দেশনা কিংবা কৌশলের জটিল হিসাব। ছিল শুধু বল, পা আর কল্পনা। সেই স্ট্রিট ফুটবল থেকেই উঠে এসেছেন কত না জাদুকর!
রোমারিওর মতে, কম বয়সী খেলোয়াড়দের সৃষ্টিশীলতা বিকাশে রাস্তার ফুটবলের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। কিন্তু অতিরিক্ত নিয়মতান্ত্রিকতা ও কৃত্রিম পরিবেশ তরুণদের সহজাত প্রতিভা বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিক ফুটবলে শারীরিক সামর্থ্যের বাড়তি চাহিদা। তাঁর মতে, এখন অনেক ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার চেয়ে গতি ও শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে সহজাত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রোমারিও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, ‘শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করা যায় না। সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’
কথাটি শুনলে কাকার পরের ব্রাজিলের কথা মনে পড়ে। প্রথমে নেইমার, তারপর ভিনিসিয়ুস—যেন একজনের কাঁধেই পুরো দেশের ফুটবলের স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিভার ভিড়ে বিশ্বসেরা কোথায়?
ব্রাজিলের সমস্যা শুধু সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়ের ঘাটতি নয়; বিশ্বসেরাদের সমমানের ফুটবলার যথেষ্ট তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ বিশ্বের অন্য দেশগুলো থেমে নেই। প্রতি বছর নতুন প্রতিভা উঠে আসছে, বদলে যাচ্ছে ফুটবলের প্রতিযোগিতার মানচিত্র।
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসেও বিভিন্ন দেশের আধিপত্য স্পষ্ট। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স জিতেছে আটবার করে। পর্তুগাল, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস সাতবার করে। ব্রাজিল, ইতালি ও ইংল্যান্ডের ঝুলিতে রয়েছে পাঁচটি করে পুরস্কার।
অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দেশ ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তারা। ইউরোপের ক্লাবগুলোতে প্রতিবছর অসংখ্য ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার খেলতে যান। কিন্তু বিপুল এই প্রতিভার ভিড় থেকে বিশ্বসেরা হয়ে উঠছেন কতজন?
একসময় ব্রাজিলিয়ানদের পায়ের জাদু দেখার জন্য অপেক্ষা করত ফুটবলবিশ্ব। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহিও কাকার মতো তারকারা ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে দেশটির ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এখন সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে রোনালদোর অতীতের ঝলক দেখতে হয়।
ব্রাজিলের ফুটবল কি আবার সেই সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে পারবে? উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কীভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের মধ্যেই।













