মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু আমাদের মন থেকে কি সত্যিই বিদায় নিতে পারবেন?
- 1
মেসির শেষ ম্যাচে যে কারণে থাকতে পারছেন না দিবালা ও মলিনা
- 2
বেনিনের ‘সবাই’ মেসির বিদায়ী জার্সি পেতে চায়
- 3
টিভিতে আজকের খেলা, সোমবার ৫ অক্টোবর ২০২৬
- 4
‘আমার ছেলে যা হতে চায়, তা-ই হবে’: মায়ের সেই সাহসে ডায়াবেটিসকে হারিয়ে নিউইয়র্ক জয় জভেরেভের
- 5
৯ মাসে বিনোদন অঙ্গনের আলোচিত চার বিচ্ছেদ, গুঞ্জন থেকে প্রকাশ্যে যেভাবে

মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু আমাদের মন থেকে কি সত্যিই বিদায় নিতে পারবেন?
মেসি বিদায় নিলেন, কিন্তু আমাদের মন থেকে কি সত্যিই বিদায় নিতে পারবেন?
আজ পৃথিবীর মন খারাপ। আকাশে-বাতাসে যেন সেই মন খারাপেরই প্রতিধ্বনি। মানুষে মানুষে কত বিভেদ—ভাষায়, কাঁটাতারে, মানচিত্রে। অথচ মন খারাপের জায়গাটা আজ যেন এক। কারণ, মেসি বিদায় নিয়েছেন।
একজন ফুটবলারের বিদায়ে পৃথিবীর এত মানুষের মন খারাপ হওয়ার ঘটনা বোধ হয় খুব বেশি নেই। মেসি কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন? উত্তরটা হয়তো খুব সহজ—তিনি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছেন।
কারও কৈশোর জড়িয়ে আছে তাঁর পায়ের জাদুর সঙ্গে, কারও তারুণ্য, কারও বন্ধুত্ব, কারও রাত জাগা। কারও জীবনের সবচেয়ে আনন্দের রাত হয়তো মেসির কোনো একটি ম্যাচের রাত। আবার তাঁর কোনো হারও হয়ে উঠেছে মন খারাপের কারণ, তর্কের বিষয় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর আলোচনার উপলক্ষ।
কত রাত যে কেটেছে মেসির সঙ্গে—দুই পায়ের জাদুতে হাততালি আর চিৎকার দিয়ে—তার ইয়ত্তা নেই। পরদিন পরীক্ষা থাকলেও খেলা দেখেছি। সকালে ক্লাস থাকলেও রাত জেগেছি। ঘুম চোখে সকালে উঠে বন্ধুর সঙ্গে আগের রাতের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করেছি।
তখন একবারও মনে হয়নি, একদিন এসবই স্মৃতি হয়ে যাবে।
একটা সকাল আসবে, যেদিন মেসির বিদায়ের কথা লিখতে বসে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়বে। মনে হবে, বলতে ইচ্ছে করছে—‘যেতে আমি দিব না তোমায়।’
বার্সেলোনার মেসি ছিলেন বিস্ময়ের নাম
বার্সেলোনার মেসিকে দেখার মধ্যে ছিল এক ধরনের বিস্ময়। বলটা তাঁর পায়ে গেলেই মনে হতো—কিছু একটা হতে চলেছে। একজন খেলোয়াড়ের কাছে দর্শকের এই উৎকণ্ঠার চেয়ে পূর্ণতার অনুভূতি আর কী হতে পারে?
মেসি অসাধারণ। আমার কাছে তিনি ফুটবলের কবি।
কী অসম্ভব, কী ভয়ংকর সুন্দর তাঁর খেলার কৌশল! বাঁ পায়ে বল থাকলে তিনজন ডিফেন্ডারকেও যথেষ্ট মনে হতো না। তাঁর গোলের সৌন্দর্য তো আছেই, কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়েছে, তাঁর একটি পাসও একটি গোলের চেয়ে সুন্দর।
তাঁর খেলা দেখলে মনে হতো না, ফুটবল কঠিন কোনো খেলা। বরং মনে হতো, ফুটবল বুঝি এমনই সহজ—বল পায়ে নাও, কয়েকজনকে কাটিয়ে যাও, তারপর জালে জড়িয়ে দাও।
আর্জেন্টিনার মেসি ছিলেন মায়ার
আর্জেন্টিনার মেসির সঙ্গে সম্পর্কটা আবার একটু অন্য রকম। এখানে মুগ্ধতার সঙ্গে মিশে আছে মায়া।
কারণ, তাঁর এই যাত্রাটা সব সময় সুখের ছিল না। ফাইনালে হেরে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে সমালোচনা। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের কথাও বলতে শুনেছি তাঁকে।
তারপর এলো ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনা জিতল। মেসির মুখের সেই হাসিটা এখনও মনে আছে। মনে হয়েছিল, বহু বছরের একটা অপেক্ষা বুঝি শেষ হলো।
কিন্তু সবচেয়ে বড় অপেক্ষাটা তখনও বাকি।
হাতে বিশ্বকাপ উঠলেই যেন পূর্ণতার বাঁশি বাজবে।
কাতারের সেই রাত
২০২২ সালের বিশ্বকাপের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর আজও অন্য রকম একটা অনুভূতি হয়।
প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার। চারদিকে হতাশা। মনে হচ্ছিল, আবার কি সেই পুরোনো গল্প হবে? এত কাছে গিয়েও কি আবার ফিরে আসতে হবে?
কিন্তু প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে পরিষ্কার হতে থাকল—মেসি শুধু একটি টুর্নামেন্ট খেলছেন না। তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের জীবনের অসমাপ্ত গল্পের শেষ অধ্যায়ের দিকে।
তারপর সেই ফাইনাল।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।
সেই রাত কি ভোলা যায়?
নাটকের পর নাটক, গোলের পর গোল, উত্তেজনার পর উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউট। আর মেসির হাতে উঠল স্বপ্নের বিশ্বকাপ।
সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল, মেসির গল্পের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটাও পূর্ণ হলো।
বিদায় নিলেন মেসি, কিন্তু সত্যিই কি চলে গেলেন?
আজ সেই রূপকথার গল্পের নায়কই ফুটবলকে বিদায় বললেন।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁকে আর বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখব না। ম্যাচ শুরুর আগে আর মনে হবে না—মেসি কী করবেন? বলটা তাঁর পায়ে গেলেই যে অদ্ভুত প্রত্যাশা তৈরি হতো, সেটাও আর হবে না।
কিন্তু মেসি কি সত্যিই চলে যাচ্ছেন?
কোনো এক রাতে ইউটিউবে পুরোনো ম্যাচ চালিয়ে বসব না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো রিলে হঠাৎ তাঁর কোনো গোলের দৃশ্য দেখে থমকে যাব না?
অবশ্যই যাব।
মেসির অর্জন কি কেবল ট্রফি? মনে হয় না।
তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তিনি‘সবার’হয়ে উঠতে পেরেছেন। তর্কের খাতিরে কেউ নানা কথা বলতেই পারেন। কিন্তু মেসির খেলার প্রশংসা না করে থাকা কঠিন।
‘আরেকটা ম্যাচ খেলুন, মেসি’
হ্যাঁ, মেসি আজ সত্যিই বিদায় নিয়েছেন।
বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন,‘মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যাই, তবে আমার মনে হচ্ছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।’
কিন্তু কেন জানি না, এই বাস্তব সত্য মেনে নিতে মন মানছে না।
মনে হচ্ছে, ডেকে বলি—আরেকটু থাকুন। আরেকটা ম্যাচ খেলুন। আরেকবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামুন। বাঁ পায়ে বল নিন। তারপর কয়েকজনকে কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে গোল করুন।
আমরা আরও অনেক রাত জাগতে চাই।
আপনাকে নিয়ে আলাপ করতে চাই। তর্ক করতে চাই। চিৎকার করে বলতে চাই—
মেসি, মেসি, মেসি।
ম্যাচের একেবারে শেষ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই। বলতে চাই—
মেসি আছেন, কিছু না কিছু একটা হবে।
সময় থেমে থাকে না, মেসিও থাকলেন না
সময় বড় কঠিন বিচারক। তাকে ম্যানুপুলেট করা যায় না, ধরে রাখা যায় না। শুধু বয়ে যেতে দিতে হয়।
তাই ইচ্ছা থাকলেও কাউকে ধরে রাখা যায় না।
একদিন কবিকে কলম নামিয়ে রাখতে হয়। শিল্পীকে থামাতে হয় সুর। খেলোয়াড়কে খুলে রাখতে হয় জার্সি।
মেসিও রাখলেন।
কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসা কি ফুরিয়ে যাবে?
যাবে না।
তিনি থাকবেন—হৃদয়ে, নিভৃতে, নীরবে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
‘যেতে নাহি দিব। যত বার পরাজয়
তত বার কহে, আমি ভালোবাসি যারে
সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।’
মেসি হয়তো মাঠ ছাড়লেন।
কিন্তু আমাদের কৈশোর, তারুণ্য, রাত জাগা, বন্ধুত্ব, উল্লাস আর অসংখ্য স্মৃতি থেকে তিনি কোথায় যাবেন?
মেসি, বিদায় নয়—আপনি থেকে যাবেন।














